পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা পার্টি এই দুই রাজনৈতিক দলের টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করেই যে আবর্তিত হচ্ছে এটা কমবেশি সবাই জানে। তৃণমূল যেমন বিজেপিকে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক দল বলে তোপ দাগচ্ছে, তেমনি পাল্টা বিজেপির পক্ষ থেকে তৃণমূলকে সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িকতার মদতদাতা হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিজেপি তৃণমূল ভাঙিয়ে যোগদান মেলা আয়োজিত করছে, তার পাল্টা তৃণমূলও সুযোগ পেলেই দলে দলে বিজেপি নেতা কর্মীদের হাতে জোড়া ফুল পতাকা ধরিয়ে দিচ্ছে। এরই মাঝে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তৃণমূলের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছে যার উত্তর খুব একটা পরিষ্কার করে এখনো পর্যন্ত বিজেপি দেয়নি।

বিষয় হল তৃণমূল কংগ্রেস যদি রাজ্যের ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয় সেক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে আবার মুখ্যমন্ত্রী হবেন সেই বিষয়টি প্রায় সবাই জানেন। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসলে কে মুখ্যমন্ত্রী হবে তা নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো সদুত্তর নেই। আর ঠিক এই জায়গাটাতেই বারবার চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে রাজ্যের শাসক দলের পক্ষ থেকে। ঘটনা হলো এই রাজ্যের আদি বিজেপি নেতা এবং আরএসএস থেকে আগত নেতা এই দুইয়ের যোগ ফলে যারা গেরুয়া শিবিরের ঘরের ছেলে তাদের মধ্যে থেকে আদৌ কেউ মুখ্যমন্ত্রী হ‌ওয়ার যোগ্য কিনা তা নিয়ে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আছে।

পশ্চিমবঙ্গ,
স্বপন দাশগুপ্ত; source- Twitter

শেষ দু দিনের রাজ্য সফরে এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিজেপির নাম্বার টু অমিত শাহ পরিষ্কার বলে দিয়েছেন বাংলার কোনো ভূমিপুত্রকেই তারা এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী করবেন, যদি বিজেপি ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়। কিন্তু তিনি কারোর নাম করেননি। এরপরই এই রাজ্যের বিজেপি নেতাদের নিয়ে জল্পনা তীব্র হয়ে উঠেছে। আমরা বরং দেখিনিই একুশের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি যদি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয় তাহলে কাদের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

১) স্বপন দাশগুপ্ত

প্রাক্তন সাংবাদিক স্বপন বাবু হাওড়া জেলার মানুষ। তিনি বর্তমানে বিজেপির পক্ষ থেকে অন্যতম রাষ্ট্রপতি মনোনীত রাজ্যসভার সাংসদ। প্রথমে স্বপন দাশগুপ্তকে বিজেপি রাজ্যসভায় নিয়ে গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে দলের প্রভাব বিস্তার করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু খুব দ্রুত দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির নীতি নির্ধারণ এবং কৌশল রচনার কাজে এই শিক্ষিত এবং মার্জিত সাংসদ যথেষ্ট সুচিন্তিত মতামত দিচ্ছেন। খুব দ্রুততার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিজেপির অভ্যন্তরে কান পাতলে শোনা যায় এই রাজ্যের অনেক বাঘা বাঘা বিজেপি নেতা যখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েও অনেক সময় অ্যাপোয়েন্টমেন্ট পাননা, তখন কিন্তু স্বপন বাবুর জন্য প্রধানমন্ত্রীর দরজা নাকি সব সময়ের জন্য খোলা!

রাজনৈতিক মহল মনে করে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হলে রুচিশীল এবং মার্জিত বাঙালির প্রতিনিধি হিসাবে এই রাজ্যসভার সংসদকে মুখ্যমন্ত্রী করতে পারে বিজেপি। সে ক্ষেত্রে শিক্ষিত বাঙালিরা খুব একটা অস্বস্তিতে পড়বেন না। তাছাড়া অতীতে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকাটাও স্বপন বাবুর ক্ষেত্রে একটা এক্সট্রা অ্যাডভান্টেজ।

images 2 15
লকেট চ্যাটার্জি; source- Times of India

২) লকেট চ্যাটার্জি

রূপা গাঙ্গুলী বিজেপিতে যোগ দিয়ে খুব দ্রুত রাজ্যের প্রথম সারির একজন নেত্রী হয়ে ওঠেন। একাধিক কর্মসূচিতে তাকে সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়, কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি যেন কোথায় একটা হারিয়ে গেছেন। আর তার সেই শূন্যস্থানের দখল নিয়েছেন লকেট চট্টোপাধ্যায়। লকেট সম্ভবত সামনে কোনো বড় লক্ষ্য নিয়েই বিজেপিটা করছেন।

হুগলি লোকসভা কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রথমবারের জন্য লোকসভায় গেলেও খুব দ্রুত বিজেপির সর্বভারতীয় নেতৃত্বের চোখে পড়ে গিয়েছেন। সেইসঙ্গে রাজ্যজুড়ে বিজেপির নানান কর্মসূচিতে দাপিয়ে বেড়াতে তাকে দেখা যায়। অনেকেই লকেট চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যে একটা প্রতিবাদী মহিলার ছবি খুঁজে পান। মনে করা হয় তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মোকাবিলা করতে গিয়ে একজন লড়াকু মহিলাকেই হাতিয়ার করতে পারে বিজেপি। সে ক্ষেত্রে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে তারা যদি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখলের সক্ষম হয় তবে লকেট হবে তাদের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী।

Dib Suvendu Adhikari Suvendu Adhikari
শুভেন্দু অধিকারী; source- The Sunday Guardian

৩) শুভেন্দু অধিকারী

মমতা বন্দোপাধ্যায়ের পর তৃণমূলের জননেতা বলতে আর কেউ যদি থাকতো তাহলে সে শুভেন্দু অধিকারীই। যদিও ইতিমধ্যেই বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন শুভেন্দু। ঘটনা হলো বিজেপির পুরানো নেতারা মানুন আর না মানুন, বর্তমানে তাদের দলের সবচেয়ে বড় জননেতা বোধহয় কাঁথির অধিকারী পরিবারের এই ছেলেটিই।

স্বাভাবিকভাবেই বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হলে মুখ্যমন্ত্রী পদের অন্যতম দাবিদার হবেন শুভেন্দু অধিকারী। যদিও তাকে মুখ্যমন্ত্রী করা হবে কিনা সেটা নিয়ে কিছু সংশয় আছে। কারন অতীতে বিভিন্ন রাজ্যে দেখা গিয়েছে অন্য দল থেকে আসা নেতাদের সর্বোচ্চ পদ দেবার ক্ষেত্রে ভারতীয় জনতা পার্টির একটা অনীহা আছে। তারা সঙ্ঘ পরিবার ঘনিষ্ঠ কাউকেই সাধারণত মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত করে। তবে বাকি সমস্ত নেতাদের তুলনায় মুখ্যমন্ত্রী পদে শুভেন্দু যে অনেক বেশি জোরালো দাবি রাখতে সক্ষম হবে তা এখন থেকেই অনুমান করা যায়।

images 3 16
দিলীপ ঘোষ; source- Deccan Herald

৪) দিলীপ ঘোষ

দিলীপ ঘোষের সাংগঠনিক দক্ষতা এবং একটা বড় অংশের বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তবে তার মানসিকতা এবং ভাব ভঙ্গি ঠিক পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদের সঙ্গে মানানসই নয়। এটা বিজেপির অভ্যন্তরে কান পাতলেই শোনা যায়। অনেক বাঙালি আছে যাদের বিজেপিকে নিয়ে খুব একটা আপত্তি না থাকলেও দিলীপ ঘোষ মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন এই সম্ভাবনার কারণেই চায়না বিজেপি রাজ্য ক্ষমতায় আসুক!

আসলে বাঙালির যে চিন্তা, মনন এবং শিল্পের প্রতি স্বাভাবিক টান আছে তার সম্পূর্ণ বিপরীত জায়গায় অবস্থান করেন দীলিপ বাবু। তবু একটা বিষয়ে তাকে আর পাঁচটা বিজেপি নেতার থেকে এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে এগিয়ে রেখেছে, সেটা হলো তার আরএসএস যোগ। ঘটনা হলো দীর্ঘদিন ধরে সংঘের অন্যতম প্রচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি এবং বিজেপির প্রবণতা অনুযায়ী এই সঙ্ঘ যোগ মুখ্যমন্ত্রী পদের ওই সর্বোচ্চ আসনে তাকে বসিয়ে দিতেই পারে।

৫) সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়

এই তালিকার সবকটি নামের মধ্য থেকে এটিই বোধহয় সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত বিপুল সংখ্যক বাঙ্গালীদের কাছে! তবে বাঙালির কাছে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা এবং ভাবমূর্তি নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এরকম হতেই পারে দলের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব রুখতে এবং রাজ্যের ক্ষমতা দখলকে নিশ্চিত করতে সৌরভকেই ভোটের আগেই মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করে দিলো বিজেপি।

এক্ষেত্রে বাঙালির একটা বড় অংশ যেমন মানসিকভাবে ধাক্কা খাবে তেমনি ভোটের বাক্সে বিজেপি যে ব্যাপক ফায়দা পাবে তা এখন থেকেই বলে দেওয়া যায়। ঘটনা হলো সৌরভের বিজেপিতে যোগ দেয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বেশ অনেকদিন ধরেই নানান জল্পনা শোনা যাচ্ছে। এটা ঠিক বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে যথেষ্ট যোগাযোগ আছে বাঙালির এই আইকনের। হতেই পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতা করতে বাঙালির এই আইকনকেই মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করল বিজেপি।

এই তালিকা দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে মুকুল রায় কোথায় গেলেন? ঠিক এবং একইসঙ্গে ভুল। আমাদের মনে হয় না মুকুল রায়কে বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী করবে এবং তিনিও মুখ্যমন্ত্রী হতে খুব একটা চেষ্টা করবেন বলে। কারণ মুকুল রায়ের মতো মানুষরা ভারতীয় রাজনীতিতে বরাবরই পিছন থেকে ঘুঁটি সাজানোর দায়িত্ব পালন করেন। আর তাছাড়া এরকম বিপুল সাংগঠনিক দক্ষতা সম্পন্ন এই তুখোড় রাজনীতিবিদের হাতে রাজ্যের সমস্ত ভার তুলে দেওয়ার মতো ভুল বিজেপি করবে বলে মনে হয় না। হ্যাঁ, কাকে মুখ্যমন্ত্রী করা হবে সেই বিষয়ে মুকুল রায়ের মতামত অবশ্যই গুরুত্ব পাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here