ছোট বেলায় দিদা, ঠাকুমাকে দেখতাম ছাঁদের মেঝেতে কাপড় পেতে ঠাটা পোড়া রোদের মধ্যে কাঁচা আমলকি শুকতে দিত। তখন কৌতুহল বসে জিজ্ঞাস করতাম এগুলো দিয়ে কি হবে? উত্তর যা আসত তাতে তখন তার মাহাত্ম্য বুজতে না পারলেও এখন তা বেশ ভালোই বুঝি ।

আমলকি বা আমলকি একপ্রকার ভেষজ ফল। যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন রোগ উপশমের উপকারী দৃষ্টান্ত। সংস্কৃত ভাষায় এর নাম ‘আমালিকা’। অনেকেই এই উপকারিতা সম্পর্কে তেমন ওয়াকিবহল নন। অনেকেই এই উপকারিতা বিষইয়ক প্রশ্ন করলে বলবে হজম করায়। কিন্তু না আমলকীর জন্ম শুধু হজমের জন্য নয়। এটি এমন একটি ভেসজ ফল যার গুনাগুনের শেষ নেই। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে কিন্তু এর জুরি মেলা ভার। আমলকীতে আছে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ ও বি, আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, কার্বোহাইড্রেট, ফাইবার জাতীয় পদার্থ যা আমাদের শরীকে সুস্থ রাখতে, রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। তাই আজ কথা বলব আমলকীর সেই সকল অজানা গুন সম্পর্কে।
আমলকীতে লুকিয়ে রোগের নিধন
উপকারে ভরপুর আমলকীর বীজ

আমরা আমলকী খেয়ে তার ভেতরের বীজটি ফেলে দি। কিন্তু না আমলকীর কোন অংশই ফেলে দেওয়ার নয়। ডগা থেকে বীজ সমস্ত কিছুই বিশেষ উপকারী। ফল ছাড়াও বীজের ভেতর নিহিত আছে উপকারিতার অস্তিত্ব।
১) আমাদের অনেকের নিশ্বাসে , মুখের ভেতর থেকে দুর্গন্ধ হয়ে থাকে। ফলে কথা বলার সময় অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। আমলকীর গুঁড়ো কিন্তু এর থেকে নিষ্পত্তির বিশেষ ঔষুধ হিসেবে কাজ করে। প্রতিদিন জলের সাথে ১ চামচ আমলকীর বীজের গুঁড়ো মিশিয়ে খেলে অনায়াসে দূর হবে সকল দুর্গন্ধ।
২) আমলকীর বীজ টক স্বাদযুক্ত হয় তাই এই বীজ মুখের অরুচিকে মেরে স্বাদ প্রদান করে। তেঁতো মুখে রুচি ও স্বাদ বাড়ায়।
৩) শরীরকে ঠাণ্ডা রাখতে এই বীজ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। শরীর ঠাণ্ডা অর্থাৎ পেট ও ঠাণ্ডা। শরীরের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে, পেশি মজবুত করে।
আমলকীর রসের গুনাগুন

১) আমলকির রস কোষ্ঠকাঠিন্য ও পাইলসের সমস্যা দূর করতে পারে। এ ছাড়াও এটি পেটের গোলযোগ ও বদহজম রুখতে সাহায্য করে।
২) প্রতিদিন সকালে আমলকির রসের সঙ্গে মধু মিশে খান এতে ত্বকের কালো দাগ দূর হবে ও ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়বে। এর যেহেতু আমলকীতে পৌষ্টিক উপাদান থাকে তাই শীতকালীন সকল ব্যাধি থেকে মুক্তি দেয়।
৩) চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে আমলকির রস । এ ছাড়াও চোখের বিভিন্ন সমস্যা যেমন চোখের প্রদাহ, চোখ চুলকানি বা জল পড়ার সমস্যা থেকে রেহাই দেয়। আমলকীতে রয়েছে ফাইটো-কেমিক্যাল যা চোখের সঙ্গে জড়িত ডিজেনারেশন প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
৪) আমলকীর রস ব্রঙ্কাইটিস ও অ্যাজমার জন্য উপকারী।
৫) ফুসফুসের সকল সংক্রমণকে দূরে রাখে এই ফলের রস। এছাড়াও রক্তের লোহিত কনিকাকে অর্থাৎ হিমোগ্লোবিনের মাত্রাকে বাড়িয়ে তোলে এই রস।
৬) আমলকি রস টনিক হিসেবে কাজ করে এবং চুলের পরিচর্যার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি কেবল চুলের গোড়া মজবুত করে তা নয়, এটি চুলের বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে এবং চুলের খুসকির সমস্যা দূর করে ও চুলের পক্কতা প্রতিরোধ করে।
উপকারিতা শুকনো আমলকীতে

শুধু কাঁচাতেই নয় শুকনোতে লুকিয়ে অনেক গুন। সমস্ত ঋতুতে এই ফলের ফলন হয় না তাই অনেকেই শুকনো করে একে সেবন করে থাকে। এর থেকেও হয় অনেক উপকার
১) শুকনো আমলকী অনিদ্রা দূর করতে সক্ষম।
২) রোজ দুবেলা খাবার পড় এটি খেলে বদহজমজনিত সকল সমস্যার নিরাময় ঘটবে।
৩) আমাদের শরীরের বিভিন্ন কোষকে উজ্জীবিত করতে সাহায্য করে, নতুন কোষের উৎপত্তি ঘটায়।
৪) কফ, গা গোলানো ভাব, বমি বমি, ব্যথা-বেদনা এই সকল রোগের ঔষধ শুখনো আমলকী।
৫) আধা চূর্ণ শুষ্ক আমলকী এক গ্লাস জলে ভিজিয়ে খেলে হজম সমস্যা কেটে যাবে।
গুঁড়ো আমলকীর গুনাগুন

অনেকেই কাঁচা বা শুকনো আমলকী খেতে পারে না তাঁদের জন্য আমলকী শুকিয়ে গুড়ো করে রাখা উচিৎ এতেও অনেক সমস্যার সমাধান হয়।
১) আলসার বা গ্যাস্ট্রিক জাতীয় রোগের যম এই গুঁড়ো আমলকী।
২) গরমজলে আমলকীর গুঁড়ো মিশিয়ে খান দেখবেন শরীরের অপ্রয়োজনীয় ফ্যাট ঝরাতে সাহায্য করছে।
৩) দাঁতের ক্ষয় রোধ করে, ঘন ঘন রক্ত পড়া, মাড়ি ফুলে যাওয়া থেকে নিষ্পত্তি ঘটে ও পাতলা নখকে মজবুত রাখে, অসময়ে ভেঙে যায় না ।
৪) এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান বুড়িয়ে যাওয়া ও সেল ডিজেনারেশন প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
৫) ব্লাড সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রেখে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। কোলেস্টেরল লেভেলেও কম রাখতে যথেষ্ট সাহায্য করে।

তো দেখলেন তো একটা ছোট্ট ফল কত উপকারে লাগে তা আমরা কেউই জানতাম না। তাই আবার থেকে আমলকী কিনে কোন অংশ আর ফেলে দেবেন না। সেগুলিকে কাজে লাগান। শরীরের সকল রোগ নিরাময়ে এই ফল বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আমরা চুন থাকে পান খসলেই ডাক্তারের কাছে দৌড়াই কিন্তু ভেবে দেখিনা বাড়িতে উপস্থিত আছে সেই রোগের মখ্যোম ওষুধ। তালে আবার আপনারাই বলুন সত্যি আমলকী শ্রেষ্ঠ ভেসজের দিক থেকে এগিয়ে কিনা ? আশা করব আমার এই প্রচেষ্ঠা আপনাদের একটু হলেও কাজে লাগবে তাই অন্যদেরকেও আনাতে ভুলবেন না।