পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ধর্মীয় সংগঠনগুলির প্রভাব বাড়তে শুরু করে ২০০৮-০৯ সাল থেকে। তার আগে দীর্ঘ বামপন্থী শাসনের সময় ধর্মীয় সংগঠনগুলি কেবলমাত্র সামাজিক কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকত। তারা রাজনীতির পরিসরে তেমন একটা নাক গলানোর চেষ্টা করত না। এ রাজ্যের রাজনীতিতে ধর্মীয় সংগঠনগুলির সাহায্য নেওয়া প্রথম তৃণমূল কংগ্রেস শুরু করে। তৃণমূলের তৎকালীন সর্বভারতীয় সম্পাদক মুকুল রায় এক্ষেত্রে মূল উদ্যোগটি নিয়েছিলেন।

পরবর্তী সময়ে দক্ষিণপন্থী প্রতিটি রাজনৈতিক দলই নিজের নিজের মতো করে ধর্মীয় সংগঠনগুলিকে কাছে টানার চেষ্টা করেছে, যা বর্তমানেও অব্যাহত। এই সময়ের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী ধর্মীয় সংগঠন হিসাবে উঠে আসে ঠাকুরনগরের ঠাকুরবাড়ি এবং ফুরফুরা শরীফের পীরজাদারা।

images 22 2
PB Media

ফুরফুরা শরীফের তিনজন পীরজাদার মধ্যে অন্যতম ত্বহা সিদ্দিকীর সঙ্গে প্রথম সম্পর্ক গড়ে তোলেন মুকুল রায়। সেই সূত্রে ২০০৯ এর লোকসভা ভোটের সময় থেকে ত্বহার সমর্থন পেয়ে আসছে তৃণমূল। মুকুল রায় দল পরিবর্তন করে বিজেপিতে যোগ দিলে মাঝে কিছুদিনের জন্য তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল ত্বহা সিদ্দিকীর। যদিও পরবর্তী সময়ে সেই সমস্যা মিটে যায়। কিন্তু বর্তমানে ফুরফুরা শরীফের পীরজাদা পরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে পড়তে শুরু করেছে।

পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকীর ভাইপো পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করার কথা ঘোষণা করেছেন। আব্বাস সিদ্দিকী তার তৃণমূল বিরোধী অবস্থানের জন্য সুপরিচিত। তিনি জানিয়েছেন সংখ্যালঘু, দলিত এবং আদিবাসী মানুষদের নিয়ে তার গড়া ফ্রন্ট আগামী বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। তার নিজস্ব সামাজিক সংগঠন “আহলে সুন্নাতুল জামাতের” মাধ্যমে ইতিমধ্যেই দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও উত্তর ২৪ পরগনার একাংশে ঘর গোছানোর কাজ শুরু করে দিয়েছেন পীরজাদা।

images 23 3
WB Tourism

ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের কাছে রাজনৈতিক দল নথিভূক্ত করার যাবতীয় কাগজপত্র জমা করে রে দিয়েছেন তিনি। আগামী জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকেই সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের এই নতুন রাজনৈতিক দলটির নাম জানা যাবে। আব্বাস সিদ্দিকী পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ময়দানে প্রবেশ করলে ভোটের অনেক হিসেবই বদলে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই দল আগামী বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করলে এই রাজ্যের রাজনীতিতে কি কি প্রভাব পড়তে পারে সেটাই বরং একটু আলোচনা করে দেখি –

১) তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটে ভাঙ্গন ধরবে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের ক্ষমতা ধরে রাখার অন্যতম কারণ হলো এ রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ ভোট তাদের ঝুলিতে যাওয়া। বিজেপি ধর্মীয় মেরুকরণ করতে শুরু করায় স্বাভাবিকভাবেই সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশের ভোট বিজেপির দিকে চলে যায়। এই পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু ভোট পাওয়াটা তৃণমূলের পক্ষে খুবই জরুরি। কিন্তু পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করলে নিশ্চিতরূপেই বলা যায় তারা তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্কের ওপর একটা বড় থাবা বসাবে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও উত্তর ২৪ পরগনা এই দুই জেলার বেশিরভাগ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট এই নবগঠিত দলের ছাতার তলায় চলে আসতে পারে। সেই সঙ্গে হাওড়া হুগলি জেলাতেও ব্যাপক প্রভাব আছে এই ধর্মীয় নেতার। সেক্ষেত্রে একুশের বিধানসভা নির্বাচনে ভালো ফল করার তৃণমূলের পক্ষে বেশ সমস্যা হয়ে যাবে। কারণ দক্ষিণবঙ্গের দুই চব্বিশ পরগনাকে তৃণমূলের সবচেয়ে শক্ত ঘাঁটি বলে মনে করা হয়। সেখানে খারাপ ফল হলে এই ঘাটতি রাজ্যের অন্যত্র থেকে মেটানো বেশ কঠিন হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের পক্ষে।

images 24 3
Hindustan Times

২) জেতা আসন হাতছাড়া হয়ে যাবে তৃণমূলের

দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং উত্তর ২৪ পরগনা মিলিয়ে মোট বিধানসভা কেন্দ্রের সংখ্যা ৬৪ টি। এই দুই জেলার বড় সংখ্যক আসনেই সংখ্যালঘুরা নির্ণায়ক শক্তি। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকীর রাজনৈতিক দল ভোট কেটে নেওয়ার ফলে এই দুই জেলার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ টি বিধানসভা আসনে হেরে যেতে পারে তৃণমূল প্রার্থীরা!

৩) একুশের ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে বিজেপির সুবিধা হবে

আব্বাস সিদ্দিকী পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মঞ্চে অবতীর্ণ হলে নিঃসন্দেহে তার মূল পুঁজি হবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট। এই পরিস্থিতিতে তিনি তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কেই যে মূল থাবাটা বসাবেন তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। স্বাভাবিকভাবেই বিজেপি অ্যাডভান্টেজ পেয়ে যাবে এর ফলে। কারণ অনেক জায়গাতেই সংখ্যালঘু ভোট ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার ফলে বিজেপি প্রার্থীরা জিতে যেতে পারে। তাই বিজেপিও চাইছে আব্বাস সিদ্দিকী ভোট ময়দানে কোমর বেঁধে ভালোভাবেই নেমে পড়ুক।

৪) বাম-কংগ্রেস জোটে শামিল হয়ে তৃতীয় ফ্রন্ট গড়ে তুলতে পারে

ভোট বড় বালাই। বামপন্থী নেতারা মুখে যতই বলুন যেকোনো ধর্মীয় রাজনীতি থেকে তারা দূরে থাকেন, হতেই পারে একুশে বিধানসভা ভোটের আগে তারা পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকীর এই নবগঠিত দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে নিলেন। আর তা যদি সম্ভব হয় তাহলে অত্যন্ত শক্তিশালী তৃতীয় পক্ষ হিসাবে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ময়দানে উদয় ঘটবেই বাম-কংগ্রেস জোটের। আব্বাস সিদ্দিকীর পক্ষেও বাম-কংগ্রেস জোটের সঙ্গে হাত মেলানো খুব একটা কঠিন হবে না। কারণ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসকে বেশ ভালই ভরসা করে। তৃণমূল ক্ষমতায় থাকায় স্বাভাবিকভাবেই বিজেপি বিরোধিতার ইস্যুতে সংখ্যালঘুরা তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আব্বাস সিদ্দিকের সঙ্গে জোট বাঁধলেও সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্কের বেশিরভাগটাই নিজেদের দিকে ঘুরিয়ে নিতে পারে বাম-কংগ্রেস জোট।

images 25 3
Twitter

৫) মিমের সঙ্গে জোট বেঁধে সম্পূর্ণ অচেনা সমীকরণের জন্ম দিতে পারেন পীরজাদা

একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন হায়দ্রাবাদের সাংসদ এবং মিমের সভাপতি আসাদুদ্দিন ওয়াইসিকে তার ভালো লাগে। তিনি এও জানান আগামী বিধানসভা নির্বাচন উপলক্ষে মিমের সঙ্গে তার রাজনৈতিক দল জোট গড়ে তুলবে কি না তা নিয়ে ভাবনা চিন্তা চলছে। এই রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর এই দুই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ভিত্তিক দলের ব্যাপক প্রভাব আছে। দক্ষিণবঙ্গের মুসলমান জনসমাজের ওপর আব্বাস সিদ্দিকী ও তার সংগঠনের যেমন একচেটিয়া প্রভাব আছে, তেমনি উত্তরবঙ্গের মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে বেশ ভালই প্রভাব আছে মিমের। এই পরিস্থিতিতে এই দুই দল যদি জোট বাঁধে সেক্ষেত্রে এই রাজ্যের বেশিরভাগ মুসলিম ভোট এক ছাতার তলায় সংঘটিত হতে পারে। তা যেমন বিজেপিকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা দেবে তেমনি এক সম্পূর্ণ নতুন রাজনীতির জন্ম হবে পশ্চিমবঙ্গে।

নতুন দল শুরু হওয়ার আগেই অবশ্য দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়, ক্যানিং, কুলতলি এবং উত্তর ২৪ পরগণার আমডাঙ্গার মতো জায়গায় তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে একাধিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে পীরজাদা অনুগামীরা। এর আগে আব্বাস সিদ্দিকী তৃণমূলের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়ে ছিলেন তাদের দলের জন্য ৪৪ টা বিধানসভা কেন্দ্র ছেড়ে দিলে তারা বাকি সমস্ত জায়গায় তৃণমূলকে সমর্থন করবেন। এই দাবি পত্র পাঠ খারিজ হয়ে যাওয়ার পর এখন নতুন উদ্যমে রাজনীতির ময়দানে নেমে পড়েছেন এই ধর্মীয় নেতা। তার কথাবার্তা শুনলে বোঝা যায় সংখ্যালঘু ভোটকে এক ছাতার তলায় আনা যেমন তার উদ্দেশ্য তেমনি তৃণমূল কংগ্রেসকে শিক্ষা দেওয়াও তার অন্যতম লক্ষ্য। আব্বাস সিদ্দিকীর নতুন রাজনৈতিক দলের আগামী বিধানসভা ভোটের অনেক হিসেব নিকেশ পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা আছে বলেই মনে হচ্ছে। যদিও তার কাকা ত্বহা সিদ্দিকীকে দিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা সামলে নেবার চেষ্টা তৃণমূলের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। তবে লাভ কতটা হবে সে নিয়ে আমাদের প্রত্যেকেরই মনেই একটা সংশয় বোধহয় আছে !