সোয়েটার নিয়ে কিছু কথা
source: Ravelry
শীত এসেছে, জাঁকিয়ে ঠাণ্ডা পড়লেই বের হবে সোয়েটার। এরকম পরিস্থিতিতে আমাদের সকলেরই অপেক্ষা থাকে পশমের ওমে নিজেদের শরীরকে আরাম দেওয়ার। কিন্তু শীতের দেশে সেই অপেক্ষা নেই, এটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ঘরের উষ্ণতা থেকে বাইরে বেরোলেই লাগে সোয়েটার। গরমের দেশের শীতবস্ত্র অথবা শীতের দেশের একটি সাধারণ বস্ত্র হিসেবে তাই সোয়েটারের চাহিদা পৃথিবী জুড়েই। শীতের আমেজে আজ আলোচনা করা যাক সোয়েটার নিয়ে কিছু জানা অজানা কথা।

সোয়েটার আসলে যে ঠিক কোনধরনের শীতবস্ত্রকে বলে সে বিষয়ে আমাদের ধারণা খুব একটা স্পষ্ট নয়। উলে বোনা যেকোনো জামাকেই আমরা সাধারণত সোয়েটার ভাবি। সেটা কতটা ঠিক? পুলওভার আর সোয়েটার কি এক? এধরনের নানান মজাদার তথ্য নিয়েই আজকের সোয়েটার প্রসঙ্গ।


সোয়েটার কি?

cc261a7ad3d9a9bcdb8afff54195f797
pinterest

দেহের উপরের অংশে পরিধান করা যায় এমন উল বা ক্রুশের বোনা গরম জামাকে ‘সোয়েটার’ বলে। সোয়েটার দুরকমের। মাথা গলিয়ে পড়তে হলে সেটিকে বলে ‘পুলওভার’ ; আর সামনে চেরা হলে সেটি ‘কার্ডিগান’। সোয়েটারের হাতা না থাকলে সেটিকে বলা হয় ‘ভেস্ট’। আর গলাবন্ধ অধিক লম্বা হাতার সোয়েটারকে ‘জাম্পার’ বলা হয়।

সোয়েটারের উৎপত্তি কীভাবে?

সোয়েটার নিয়ে কিছু কথা

২০০০ বছর আগে মানুষ পশম বুনতে শিখলেও ১৫ শতকের আগে পশমে বোনা কোনও জামা তৈরি হয়নি। গার্নেসি এবং জার্সির ইংলিশ চ্যানেল দ্বীপগুলিতে প্রথম হাতে বোনা শার্ট বা টিউনিকস তৈরি হয়েছিল; তাই সেটির ইংরেজি নাম জার্সি। তখন বড় হাতার ঢিলেঢালা ছিরিছাঁদহীন গরম জামাগুলোকে কেউ কেউ বলতেন জাম্পার।
প্রাকৃতিক উল থেকে বোনা জার্সি তৈরি করেছিলেন মৎস্যজীবী এবং নাবিকদের স্ত্রীরা। উদ্দেশ্য ছিল স্যাঁতসেঁতে ঠাণ্ডার হাত থেকে স্বামীদের রক্ষা করা। উলের গ্রন্থিগুলোয় একপ্রকার তেল থাকে, যা জলীয়বাষ্পের উপস্থিতিতেও পোশাক গুলিকে কনকনে ঠাণ্ডা হতে দেয়না। তাই জলে যাঁরা নিয়মিত যান তাঁদের জন্য এই পোশাক ছিল খুবই দরকারি।
এরপর জার্সির ব্যবহার পুরো ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষত শ্রমজীবীদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় হয়।

সোয়েটার ব্যবহারের গোড়ার কথা

১৮৯০-এর দশকে এই পোশাক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গৃহীত হয় এবং তখন থেকেই এর নাম হয় সোয়েটার ( যা শরীরে ঘাম উৎপাদন করে)। অ্যাথলিটরা এবং নৌ-ক্রীড়াবিদরা প্রতিযোগিতার সময় নিজেদের শরীর হালকা রাখার জন্য এইধরনের হাতে বোনা উলের পোশাক বেছে নেন। এমনকি শরীর চর্চার সময় দ্রুত ঘামার জন্যও খেলোয়াড়রা সোয়েটার ব্যবহার করতে শুরু করেন। প্রথমদিকের সেইসব সোয়েটারের রঙ হতো গাঢ় নীল। সাধারণ মানুষের মধ্যে কিন্তু তখনও সোয়েটার পড়ার চল হয়নি।

সোয়েটার নিয়ে কিছু কথা
source: tailored details

উনিশ শতকের শেষদিক থেকে সোয়েটার সাধারণ মানুষের পোশাক তালিকায় আসতে শুরু করেছিলো। ১৯২০-র দশকের ডিজাইনার জেনি ল্যানভিন এবং গ্যাব্রিয়েল (“কোকো”) শ্যানেল তাদের সংগ্রহে সোয়েটার অন্তর্ভুক্ত করার পর ফ্যাশন বাজারে এই পোশাক বিপুল জনপ্রিয় হল। বিংশ শতাব্দী জুড়ে প্রাকৃতিক এবং সিন্থেটিক ফাইবার থেকে বোনা বিভিন্ন ডিজাইনের সোয়েটার মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল। নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ সকলেই পেলেন পছন্দমতো সোয়েটার।


সোয়েটার নিয়ে আরও কিছু মজার তথ্য

the history of ugly christmas sweaters miniature shetland ponies in fair isle sweaters.jpg
Miniature Shetland Ponies in Fair-Isle Sweater

আমরা এখন কেবল শীত ঠেকাতে সোয়েটার পড়ি, কিন্তু জানেন কি সোয়েটারের আরও অনেক ক্ষমতা রয়েছে! ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় ঠাণ্ডা যুদ্ধের ( কোল্ড ওয়ার) সময়ও শক্তিশালী সুরক্ষা দিয়েছে সোয়েটার। ১৯৭৮ সালে, প্যারিসে বসবাসকারী বুলগেরিয়ান ডিফেক্টর ভ্লাদিমির কোস্তভকে হত্যার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। কারণ, একটি বিষযুক্ত তীরের ফলা তাঁর পুরু উলের সোয়েটারটি ভেদ করতেই পারেনি।


ব্রিটিশ অফিসার জেমস থমাস ব্রুডেনেলের কথা বলা যায়, যিনি ক্রিমিয়ান যুদ্ধের সময় লাইট ব্রিগেডের চার্জের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর অধস্তন সৈন্যরা ক্রিমিয়ার শীতল আবহাওয়া থেকে বাঁচতে এক বিশেষ ধরণের বোনা পোশাক পরত। এই পোশাকটি শেষ পর্যন্ত ব্রুডেনেলের নামে নামকরণ করা হয়েছিল- ‘ব্রুডেনেল, দ্য সেভেন্থ আর্ল অফ কারডিগান’ ।


পুরুষদের কারডিগানকে বলা হয় ‘ম্যান্ডিগান’।


হকি খেলোয়াড়রা খেলার সময় যে পোশাক পড়েন তাকে জার্সি বলা হয়না, বলা হয় সোয়েটার।


ইংলিশ নাট্যকার নোয়েল কাওয়ার্ড ১৯২০-র দশকে ‘টার্টলনেক’ সোয়েটারকে জনপ্রিয় করেছিলেন। এটি পুরুষদের গলাবন্ধ খোলশের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে শার্ট- টাই পড়ার অভ্যেস বজায় রাখতে সাহায্য করেছিলো। এই সোয়েটারের জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করে ১৯৬৭ সালকে একটি ফ্যাশন ম্যাগাজিনে ‘ইয়ার অফ টার্টল’ বা কচ্ছপের বছর হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল।


২০১৩ সালের অক্টোবরে নরওয়ের এনআরকে টেলিভিশন নেটওয়ার্ক প্রায় ১২ ঘন্টা ধরে “জাতীয় বুনন সন্ধ্যা” সম্প্রচার করেছিল। ভেড়ার পশম ছাড়ানো থেকে শুরু করে তা দিয়ে পোশাক বুনন পর্যন্ত সম্পূর্ণ সোয়েটার তৈরির প্রক্রিয়াটি সেখানে ছিল। ১.৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ উৎসাহ ভরে সেই অনুষ্ঠান দেখেছিলেন।


‘বিশ্রী ক্রিস্টমাস সোয়েটার’কথাটা শুনেছেন নিশ্চয়ই? প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার আগ্লি ক্রিস্টমাস সোয়েটার ডে ( Ugly Christmas Sweater) পালিত হয়। স্থানীয় কথ্য ভাষায় এরকম মজাদার নামে ডাকা হলেও আসলে এটি ক্রিস্টমাস উপলক্ষ্যে পড়া একধরনের জাম্পার। ১৯৮০-র দশকে ইংল্যান্ডে, কিছু টেলিভিশন সিরিয়ালে ক্রিস্টমাসের সময় পড়া ঢিলেঢালা ক্রিস্টমাস থিমের গরমজামা জনপ্রিয় হয়েছিল। বলা হতো, ঠাকুমা বুনে দিয়েছেন। সেই বেঢপ ক্রিস্টমাস থিম সোয়েটারই পরবর্তী সময় বিশ্রী ক্রিস্টমাস সোয়েটার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।


আপনার পছন্দের সোয়েটার কোনটি? কমেন্টে জানান, আর সোয়েটার নিয়ে আপনার জীবনে কোন স্মরণীয় ঘটনা থাকলে সেটাও আমাদের সঙ্গে শেয়ার করুন। জমে উঠুক এবারের শীত, সোয়েটারের আরামে।

https://www.banglakhabor.in/%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%b2-%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%8f%e0%a6%87-10-%e0%a6%ac%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%ac%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%9c/

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here